May 30, 2026, 9:02 am
আসিফ মুনীর: প্রায়শই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সমুদ্রপথে ইউরোপ যাত্রায় মৃত্যু আর ইউরোপ অনিয়মিত অভিবাসী প্রবেশের তালিকায় বাংলাদেশিদের নাম সামনে চলে আসে, যার জন্য নীতিনির্ধারকরা নড়েচড়ে বসেন আর সাধারণ জনগণ অনেক সময় চায়ের কাপে ঝড় তোলেন। কিন্তু অবস্থার যে কোনো গুণগত পরিবর্তন হয় না, তা ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে আমরা নিশ্চিত হই।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সমুদ্রপথে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপগামী ১,৩৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এদের সবাই বাংলাদেশি না হলেও বড় অংশই বাংলাদেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলছে, অনিয়মিত পথে ২০২৫ সালেই ইউরোপে গেছেন ২৪,৩১৮ জন। সংখ্যাগুলো নড়েচড়ে বসার মতোই। এদের অনেকেই অনিয়মিত অভিবাসনের জন্য ডিটেনশনে থাকবেন এবং এক পর্যায়ে দেশে ফেরত পাঠানো হবে। কেউ কেউ পালিয়ে অনিয়মিত অভিবাসী জীবনযাপন করবেন অনেক বছর। এদের মধ্যে খুব কম অংশই বিভিন্ন আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপের কোনো দেশে স্থায়ী বসবাসের অনুমোদন পাবেন।
প্রতি বছর এরকম অনিয়মিত বাংলাদেশি অভিবাসীর সংখ্যা বাড়ছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে ইউরোপের সেই দেশগুলোর বেগ পেতে হচ্ছে। কারণ অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রতি স্থানীয় জনগণের মনোভাব ক্রমশ বৈরি হয়ে উঠছে। অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের কার্যকরী দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে না পারলে কূটনৈতিক পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়।
অবশ্য অনিয়মিত অভিবাসন, মানব পাচার, মানব স্মাগলিং নিয়ন্ত্রণ জটিল বিষয়। এজন্য সুগঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় এবং আন্তঃসরকার সমন্বয় প্রয়োজন। এই সমন্বয় অসম্ভব নয়, তবে ধাপে ধাপে কার্যকরী পদক্ষেপ ও তদারকি দরকার।
সরকারের জন্য স্পর্শকাতর বিষয় হলো, বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ৫ বছরে ১ কোটি মানুষের প্রবাসে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করবে। অর্থাৎ প্রতি বছর ২০ লাখ মানুষ বিদেশে কাজ করতে যাবে।
বেশ কয়েক বছরে গড়ে ১০-১২ লাখ অভিবাসী কর্মী বিদেশে গিয়েছে। ২০২৬ সালে ইরান ও লেবাননে মার্কিন-ইসরায়েল সামরিক আগ্রাসন ও ইরানের প্রতিক্রিয়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমবাজার টালমাটাল, কাজেই হয়তো ঐ অঞ্চলে অভিবাসন কম হবে। এমনিতেই অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন ব্যয়, প্রবাসে ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত অভিবাসন সেবার অভাব এবং দুর্বল প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কারণে অনেক অভিবাসী কর্মী অভিবাসন অভিজ্ঞতার সব সুফল ভোগ করতে পারেন না।
অভিবাসন খাতে সরকারি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন দ্রুত উন্নত না হলে যত বেশি কর্মী বিদেশে যাবেন, তত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত অভিবাসীর সংখ্যাও বাড়বে। ইউরোপসহ এশিয়া ও আফ্রিকার সম্ভাবনাময় দেশগুলোর অভিবাসন তথ্য, বাজার গবেষণা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ না হওয়ার কারণে অভিবাসন ব্যবসায়ী, দূতাবাস, সম্পর্কিত মন্ত্রণালয়, নীতি-নির্ধারক এবং অভিবাসী প্রত্যাশীদের কাছে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কার্যকরী পদক্ষেপ নেই।
শ্রম বাজার গবেষণা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের প্রতিশ্রুতি অবশ্য নির্বাচনী ইশতেহারে আছে, সেটি দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন। শ্রম অভিবাসন ব্যবস্থাপনা, সুশাসন এবং বহুপাক্ষিক সম্মিলিত উদ্যোগ ব্যতীত ভূমধ্যসাগরগামী মৃত্যুযাত্রা কমিয়ে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। সুশাসন ও সুব্যবস্থাপনার যতই সময় লাগুক, অভিবাসী প্রত্যাশীরা ‘দেখি কী হয়’, ভেবে চুপচাপ বসে থাকবেন না।
অতীতে অন্যত্র আলোচনা করেছি যে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশিদের অভিবাসনের কাহিবি কয়েক শত বছরের। সেই অভিবাসন প্রবাসে স্থায়ী বসতি স্থাপনের জন্যই হোক বা দেশে ফিরে ব্যক্তি ও পরিবারের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের জন্য সাময়িক অভিবাসন হোক। এর সিংহভাগ ধারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয়, আর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধারাটি ইউরোপে।
বিভিন্ন সূত্রমতে ৫০ লাখের ওপর বাংলাদেশি মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় আর প্রায় সাড়ে ৯ লাখ ওপর ইউরোপে। এদের মধ্যে সাড়ে ৬ লাখ যুক্তরাজ্যে, দেড় লাখ ইতালিতে, ৭৫ হাজার স্পেনে এবং ৫০ হাজার বাংলাদেশি। এদের অনেকেই স্থায়ীভাবে ইউরোপের নাগরিক।
তবে এগুলো আনুমানিক হিসাব, কারণ ইউরোপে অনিয়মিত বাংলাদেশিদের কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান নেই, থাকার কথাও না। এক হিসাবে দেখা গেছে ২০২০-২০২৪ পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ অনিয়মিত বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছে, যাদের মধ্যে ৯৫ শতাংশের আশ্রয় আবেদন নাকচ হয়ে গেছে। এদের ছোট একটি অংশ দেশে ফিরতে পেরেছেন, বাকিরা ইউরোপের বিভিন্ন ডিটেনশন সেন্টারে অন্তরীণ আছেন।
ইউরোপে আমরা এরকম শোচনীয় অবস্থায় কীভাবে পৌঁছালাম, সেটা বুঝতে হলে আমাদের অভিবাসন ইতিহাস একটু স্মরণ করতে হবে। ইউরোপে বাংলাদেশিদের অভিবাসনের শুরু ২৫০ থেকে ৩০০ বছর আগে। গবেষকদের মতে, ভারতবর্ষের মুঘল সম্রাট শাহজাহানের নিয়োগকৃত বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার সুবেদার শাহ সুজার অনুমতিতে ১৬৫০ সাল থেকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলাদেশ অঞ্চলে বাণিজ্য পরিচালনার অনুমতি পায়।
ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা জাহাজে তাদের সাথে চা বাগান এবং অন্যত্র থেকে কর্মী সাথে করে নিয়ে যেতেন। আবার অনেকের মতে তারও আগে পর্তুগীজ ও ওলন্দাজ বণিকরা ১৫০০ শতকের শুরু থেকে বাণিজ্য জাহাজে আমাদের দেশের যাদের কাজের জন্য সাথে নিয়ে যান, তারাই সেই সময় পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডস-এ বসতি গড়ে তোলেন। আধুনিক সময়ে যুক্তরাজ্যে সিলেট ও অন্যান্য এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের আগমন ঘটে ১৯৭০-এর দশকে। ইউরোপের অন্যত্র যেমন ইতালি, স্পেন, গ্রীসে অভিবাসন আরও পরে ১৯৮০র দশকে।
অর্থাৎ যুক্তরাজ্য বা গ্রেট ব্রিটেনে বাংলাদেশিদের কয়েকশো বছরের এবং কয়েক প্রজন্মের অভিবাসন ইতিহাস ও সংগ্রাম বলে বর্তমান সময়ে এসে সামগ্রিকভাবে তাদের সংকট কম। সেই তুলনায় ইউরোপের অন্যত্র বাংলাদেশিদের অভিবাসন পঞ্চাশ থেকে ষাট বছরের এবং বড়জোর ২ প্রজন্ম ধরে প্রবাসে বসবাস। এদের অনেকেরই আবার অভিবাসন বৈধতার তারতম্য আছে, কারও কারও পরিবার প্রবাসে মিলিত হয়েছেন অনেক পরে।
চিন্তা করে দেখুন, ৩০০ বছর আগে যেভাবে লস্কর সমাজ যুক্তরাজ্যে বসতি গড়ে তুলেছেন, ঠিক একইভাবে এখনো স্বল্প দক্ষ অভিবাসন ইউরোপে চলমান। অনেক সময় এই অভিবাসন বিপদসংকুল এবং আইনবহির্ভূতভাবে, তাই সফল অভিবাসন হয় সুদূর পরাহত বা দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে।
২০০১ সালে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় হওয়ার পর থেকে অভিবাসন সংক্রান্ত আইন, বিধিমালা, সরকারি-বেসরকারি কার্যক্রম বাস্তবায়ন হচ্ছে। অভিবাসন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও রিপোর্টিং প্রক্রিয়া চলমান। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সহায়তায় এবং তাদের সাথে সমন্বয় করে সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। তথ্য প্রযুক্তি ও মানব নেটওয়ার্কের কারণে সারা বিশ্বের তথ্য এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু ইউরোপ অভিবাসন প্রত্যাশীদের দিক থেকে ইউরোপের বর্তমান অভিবাসন বাস্তবতা বিশ্লেষণ, যুগোপযোগী দক্ষতা অর্জন, আইনসম্মত অভিবাসন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কোনোটিরই যুগোপযোগী পরিবর্তন হয়নি।
সমসাময়িককালে ইউরোপে অভিবাসনের ধারা ইতালিতে। সংখ্যার দিক থেকে সেখানে কখনো আফ্রিকার কোনো দেশের অভিবাসী প্রত্যাশীদের সংখ্যা বেশি, কখনো বাংলাদেশি অভিবাসী বেশি। আশির দশকে শিক্ষিত তরুণরা ইতালিতে গেলেও সেখানে উচ্চ শিক্ষা বা পেশাজীবী অভিবাসী হিসেবে স্থায়ী হওয়া অনেকেরই সম্ভব হয়নি। তাই তারা ক্রমশ ছোটখাটো কাজ বা অনানুষ্ঠানিক কাজ থেকে আয় শুরু করেন। তাদের কিছুটা আর্থ সামাজিক অবস্থা উন্নত হতে থাকে। কেউ কেউ যুক্তরাজ্য বা পর্তুগালেও স্থানান্তর করেন। তাদের নেটওয়ার্কের ভিত্তিতে কিছু মধ্যবিত্ত তরুণ ইতালি যাওয়া শুরু করে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যগামী শ্রম অভিবাসীদের দেশের সাব এজেন্টরা বলা শুরু করলো, একটু বেশি খরচ করলে তারা ইউরোপ গিয়ে বেশি আয় করতে পারবেন, কোনো দক্ষতা লাগবে না। ইতালিতে যাওয়ার ব্যবস্থা করা যাবে, সেখান থেকে ইউরোপের দ্বার উন্মুক্ত। অনেকটা এখন যেমন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে অভিবাসন সম্পর্কে এরকম ধারণা দেওয়া হয়।
বিভিন্ন শ্রেণীর এই বাংলাদেশিরা স্বল্প দক্ষতা কাজে লাগালেও কঠোর পরিশ্রম, নেটওয়ার্ক ও জীবন সংগ্রামের উপস্থিত বুদ্ধি দিয়ে ইতালির বাংলাদেশি কমিউনিটি গড়ে তুলেছেন। দীর্ঘ দিনের অভিবাসন নয় বলে এখনো তাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অবস্থান ইতালিতে সুদৃঢ় নয়, তবে ক্রমবর্ধমান। নিজেদের অবস্থান সুনিশ্চিত করে অনেকেই তাদের পরিবারকে ইতালি এনে স্থায়ী অভিবাসী বা ডায়াসপোরার অংশ হয়েছেন।
এই ইতিহাস ও ধারাবাহিকতা ইতালি অভিবাসনপ্রবণ এলাকা যেমন মাদারীপুর বা শরিয়তপুরের বাসিন্দাদের অনিয়মিত অভিবাসনেও উৎসাহিত করে, এই উৎসাহ দানে কারও প্ররোচনা লাগে না। ঢাকায় বসে আমরা একদিকে দেখি ইতালির ভিসা আবেদনের লম্বা লাইন, অন্যদিকে দেখি ইতালি দূতাবাস আমাদের সরকারকে অনুরোধ করেই যাচ্ছে অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং অধিকতর দক্ষ ব্যক্তিদের অভিবাসন নিশ্চিত করতে।এই যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইউরোপ যাত্রা, পৌঁছানোর পর জীবন সংগ্রাম, এই জীবনযুদ্ধে তরুণ বাংলাদেশিরা অবতীর্ণ হন জীবনকে বাজি রেখেই। তারা বিশ্বাস করেন যে অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পরেও একটা সময় তাদের জন্য স্বপ্নের ইউরোপের সুন্দর ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। তাছাড়া যারা সেখানে অনেক দিন ধরে আছেন, তারা তাদের সংগ্রামের বর্ণনা নতুনদের বা অভিবাসন প্রত্যাশীদের কাছে তুলে ধরতে নাও চাইতে পারেন।
কাজেই বিপদকে তুচ্ছ করে জীবন বাজি রেখেই তরুণরা ইউরোপ যাওয়ার এডভেঞ্চারে ঝাঁপিয়ে পড়ে। যাত্রাপথের সব বাধা অতিক্রম করতে মরিয়া হয়ে থাকে। যাত্রা শুরুর পর এই মরিয়া থাকার আরও একটি কারণ হলো, যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে তারা ইউরোপের পথে পাড়ি জমান।
ভূমধ্যসাগর থেকে উদ্ধারকৃত বাংলাদেশিরা দেশে ফিরতে চান না, আবার ইউরোপের সীমান্তেই যেতে চান। তার একটি কারণ পরাজয়ের গ্লানি বহন করতে চান না, আরেকটি হলো বিশাল অঙ্কের ধারদেনা নিয়ে দেশে ফিরে সেই ধার কীভাবে শোধ করবেন। আর ইতালিও অনেকের চূড়ান্ত স্থায়ী গন্তব্য হয় না। কয়েক বছরের মধ্যে পশ্চিম বা উত্তর ইউরোপের কোনো দেশে স্থায়ী নিবাস থাকে কারও লক্ষ্য। কাজেই যেভাবেই হোক, ইতালি পৌঁছানো এদের জন্য ইউরোপ অভিবাসনের প্রথম ধাপ।
ইউরোপ অভিবাসীদের জন্য আশি-নব্বইয়ের দশকে ইতালি জনপ্রিয় হয়ে ওঠার কারণ হচ্ছে, অন্যান্য ইউরোপীয় দেশের তুলনায় বেশি অভিবাসীবান্ধব, আন্তরিক এবং সমুদ্রপথে যোগাযোগের সুবিধা। অনিয়মিত অভিবাসীদের ধাপে ধপে অস্থায়ী বসবাসের অনুমতিপত্র, বাংলাদেশ থেকে নতুন অভিবাসন অনুপ্রাণিত করেছে। প্রথমে রোমে, সেখান থেকে উত্তর ইতালির বিভিন্ন স্থানে।
তবে ২০০৮-২০০৯ সালে ইউরোপে অর্থনৈতিক মন্দার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে ইতালিতে। বাংলাদেশিদের একটি অংশ ইতালি থেকে গ্রিস, স্পেন, পর্তুগাল ও যুক্তরাজ্যে যেতে থাকে ভাগ্যের সন্ধানে। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে ব্রেক্সিট চুক্তি যুক্তরাজ্যে অভিবাসনের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। একই সাথে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল যখনই রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকেছে, তখনই সেইসব দেশ অভিবাসন বিমুখ হয়ে উঠেছে, যার প্রভাব ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশিদের ওপরেও পড়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স অনিয়মিত অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠিন অবস্থান নিয়েছে। পাশাপাশি আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও অধুনা ইউরোপের অশান্ত পরিবেশ থেকে বিগত ১০ বছরে বহু শরণার্থী ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় খুঁজছেন, যা ইউরোপের ওপর আর্থসামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক চাপ ও পরিবর্তন সৃষ্টি করছে। এর মধ্যে শরণার্থী নয়, অভিবাসন প্রত্যাশী বাংলাদেশিরা রেসিডেন্ট পারমিটের আবেদন করলে গুরুত্ব কম পাবেন, এটাই স্বাভাবিক।
একই সাথে দক্ষ অভিবাসনের এবং পেশাজীবী অভিবাসীদের গুরুত্ব বাড়ছে ইউরোপে। কায়িক শ্রমের জন্য বাংলাদেশি বা এশিয়ানদের আগে পূর্ব ইউরোপের শ্বেতাঙ্গরা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন। এমনকি আশির দশকে ইতালিতে অভিবাসনের যে আইনকানুন ছিল, বর্তমানে তা আগের থেকে কঠিন হয়েছে, অন্যান্য দেশের সাথে অভিবাসন প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
কাজেই বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপে যে অভিবাসন হয়েছে, তা এখনো অস্থিতিশীল, যেই বাস্তবতা অনেক অভিবাসী প্রত্যাশীর সিদ্ধান্ত গ্রহণের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা পায় না। এই যে ইউরোপের পরিবর্তনশীল অভিবাসন পরিস্থিতি, ইউরোপে অভিবাসন প্রত্যাশীদের এইসব তথ্য বিশ্লেষণের আগ্রহ থাকে না, থাকলে হয়তো সেভাবে নিজেদের প্রস্তুত করতে পারতেন। সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর তাদের মধ্যে অস্থিরতা কাজ করে। যত টাকা লাগুক, যেভাবেই হোক, কত দ্রুত ইউরোপ যাওয়া যাবে এটাই লক্ষ্য। এই মানসিকতা পরিবর্তন খুব কঠিন কাজ।
আশার মাঝে হতাশাও থাকে। সম্প্রতি আবারও লিবিয়া থেকে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় ১৭০ জন ইউরোপে অভিবাসী প্রত্যাশীদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, এরা সবাই অনিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়ায় ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। আরেক সংবাদ মাধ্যমে ছবি দেখা গেল, বিপজ্জনক সমুদ্রপথে ইউরোপ যাত্রার ছোট নৌকায় বিভিন্ন দেশের পুরুষের মাঝে এক বাংলাদেশি নারী। শেষ করার আগে পাঠককে একটু স্মরণ করিয়ে দেই, লিবিয়া দেশটি এবং সেখানের অভিবাসন সম্পর্কে।
উত্তর আফ্রিকা সমুদ্রসীমার একটি দেশ লিবিয়া। আফ্রিকা মহাদেশের ৫৪ দেশের মধ্যে চতুর্থ বৃহত্তম দেশ। আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বিবেচ্য। কিন্তু বিগত দেড় দশক ধরে দেশটি চলছে ভঙ্গুর রাজনীতি ও বিভক্ত প্রশাসন। দেশটিতে ২০১১ সালে জনতার আন্দোলন এবং পশ্চিমা বিশ্বের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে স্বৈরাচার শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফির যে পতন হয়, তারপর আর দেশটি এই ২০২৬-এও স্থিতিশীল রাষ্ট্র হয়নি।
সেই ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক ও সরকারের সহায়তায় লিবিয়াতে কর্মরত ৩৫,০০০ বাংলাদেশি ফিরে আসে। তারপরেও অনেক পেশাজীবী বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবায় কর্মরত বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে তখন ফেরত আসেননি, যদিও সেই পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই। অন্যদিকে অস্থিতিশীল রাষ্ট্র লিবিয়ার সাথে ২০২৩ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন সরকার শ্রম অভিবাসনের একটি সমঝোতা স্মারক সই করে।
ধারণা করা হয়, বর্তমানে প্রায় ২০,০০০ বাংলাদেশি লিবিয়াতে আছে, যাদের মধ্যে একাংশ দীর্ঘস্থায়ী বসবাসরত পেশাজীবী, আরেক অংশ খণ্ডকালীন শ্রমজীবী। এই শ্রমজীবীদের একটি বড় অংশ ইউরোপ গমন প্রত্যাশী যারা বিভিন্ন কারণে লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিতে পারেননি। মার্কিন সরকারের ২০২৫ সালের মানব পাচার প্রতিবেদন বলছে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিভক্তি এবং দুর্বল বিচার ব্যবস্থার সুযোগে বিভিন্ন সংগঠিত অপরাধী সংগঠন ও সশস্ত্র গোষ্ঠী নির্বিঘ্নে মানব পাচার ও চোরাচালান চালিয়ে যাচ্ছে।
এই অপকর্মে কিছু দুর্নীতিপরায়ণ সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তাও জড়িত আছে বলে প্রতিবেদনে প্রকাশিত। এরকম একটি অস্থিতিশীল রাষ্ট্রের সাথে আনুষ্ঠানিক শ্রম অভিবাসন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর এবং এখন পর্যন্ত চলমান রাখা অভিবাসী কর্মীদের বিপদে ফেলে রাখা। লিবিয়া ফেরত কিছু বাংলাদেশিদের সাথে বিভিন্ন সময় আলাপচারিতায় জানা যায়, তারা বন্দি অবস্থায় থেকেছেন, নিয়মিত খাওয়া পাননি, শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, এমনকি কাউকে কাউকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে সশস্ত্র সংঘাতে অংশ নিয়ে বাধ্য করা হয়েছে।
দেশে ও আফ্রিকা মহাদেশে কর্মরত রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের এহেন অবস্থা অজানা থাকার কথা নয়। তারপরেও যখনই আমাদের কর্মীদের লিবিয়া গমনের অনুমতি প্রদান দেয়া হয়েছে, তা অন্যায়। শুধু সরকারি কর্মকর্তা নয়, সাধারণ মানুষও এখন গণমাধ্যম থেকে জানে যে লিবিয়া এবং ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেওয়া কত বিপজ্জনক।
অবশ্য সম্প্রতি গোপন গোয়েন্দা তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত গণমাধ্যম প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পেরেছি, ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে ২০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য মানবপাচার সহায়তার সাথে সম্পৃক্ত। তাদের নামও গণমাধ্যমে প্রকাশিত। এরকম চক্রের কথা আগেও শোনা গেছে, এবার নাম সামনে আসলেও সেটা যথেষ্ট নয়।
শুধু বিমানবন্দর নয়, দেশে ও বিদেশে সমগ্র অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সরকারি সেবার মধ্যে মানব পাচার/স্মাগলিং ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনলেই অপরাধ চক্র ও ব্যবস্থা বন্ধ হবে না। অভিবাসন খাতের ঊর্ধ্বতন রাজনৈতিক নেতৃত্বও বিভিন্ন সভা-সেমিনারে স্বীকার করেন যে নিজেদের সর্ষে ক্ষেতে ভূত আছে।
তারা যে জেনেছেন এবং স্বীকার করেছেন সেজন্য তারা ধন্যবাদ প্রাপ্য। তবে অতীতেও ঊর্ধ্বতন মহল এরকম স্বীকারোক্তি দিয়েছেন, কিন্তু সেই ভূত নামেনি। আশা করতে চাই যে, বর্তমান সরকার অভিবাসন খাতে সরকারি পর্যায়ের দুর্নীতির ভূত নামিয়ে যুগান্তকারী দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।
আরও আশা করতে চাই যে ইউরোপে আমাদের অভিবাসী প্রত্যাশী ভাইবোনদের জন্য ইউরোপের দেশভিত্তিক আর্থসামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সঠিক তথ্য সহজলভ্য করবে। অভিবাসী প্রত্যাশীরাও অন্ধের মতো প্রতারণাকারীকে বিশ্বাস না করে তথ্যনির্ভর নিরাপদ ইউরোপ অভিবাসনের পথে হাঁটবেন। সর্বোপরি সবাই মিলে কোন একদিন যেন, ইউরোপে সমুদ্রপথে অবৈধ পথে প্রবেশ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের নাম এক নম্বরে থাকার দুর্নাম ঘোচাতে পারি।
আসিফ মুনীর : অভিবাসন বিশেষজ্ঞ
Leave a Reply